
নিজস্ব প্রতিবেদক :
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সদ্য অপসারিত চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম-এর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথাকথিত ‘গণহত্যা’ মামলাকে পুঁজি করে নজিরবিহীন চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ভয়ংকর দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আদায় করা হয়।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একাধিক ব্যাংক ডিপোজিট স্লিপ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রসিকিউটরদের প্রকাশ্য পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে নিজের ঘনিষ্ঠ এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেন।
এরপরই শুরু হয় তথাকথিত ‘মামলা-বাণিজ্য’।
জুলাই–আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে আসামি করার ভয় দেখিয়ে টার্গেট করা হতো—
বিত্তবান ব্যবসায়ী
সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ
পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তারা
মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়া, চার্জশিট থেকে অব্যাহতি অথবা গ্রেপ্তার এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো।
একাধিক সূত্রের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার বেশি অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়েছে।
এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে উঠে এসেছে প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম-এর নাম। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনিই ছিলেন সিন্ডিকেটের মূল ক্যাশিয়ার। অধিকাংশ লেনদেনই হতো নগদে, ব্যাগভর্তি টাকায়।
এই দুর্নীতির তথ্য সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে আনেন আরেক প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ। তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন— ট্রাইব্যুনালে ‘সেটলমেন্ট বাণিজ্য’ চালু রয়েছে এবং ভারী ব্যাগে ঘুষের টাকা লেনদেন হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এটি নৈতিক প্রতিবাদ নয়; বরং অবৈধ অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলেই এই গোপন তথ্য ফাঁস হয়েছে।
যদিও অধিকাংশ লেনদেন নগদে হয়েছে, তবুও সিন্ডিকেটটি এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেও ঘুষ গ্রহণ করেছে।
আমাদের হাতে এসেছে তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য ও একাধিক ডিপোজিট স্লিপ, যা থেকে প্রমাণিত হয়—
অ্যাকাউন্ট নাম: মো. আবুল হোসেন
অ্যাকাউন্ট নম্বর: ৩১৩৩২১৭০০৭৫২৮
জমা:
৫ নভেম্বর ২০২৪ → ১০ লাখ টাকা
২৭ নভেম্বর ২০২৪ → ১০ লাখ টাকা
অ্যাকাউন্ট নাম: মো. সাইফুল ইসলাম
অ্যাকাউন্ট নম্বর: ১১০১০০৬৬৬৭৬৮৮
জমা:
১,২৭,০০০ টাকা (ক্যাশ কাউন্টার)
১,৮৪,০০০ টাকা (সিআরএম)
১,৮৯,০০০ টাকা (সিআরএম)
অ্যাকাউন্ট নাম: মো. জাহিদ হাসান নয়ন
অ্যাকাউন্ট নম্বর: ১৮৭০২১০১৪০১
বড় অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ ও দুদক যদি এই অ্যাকাউন্টগুলোর স্টেটমেন্ট ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে, তাহলে পুরো চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হবে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর–ডিসেম্বরে তাজুল ইসলাম ২১ দিনের যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফরে যান। অভিযোগ রয়েছে, ওই সফরের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ হুন্ডি ও অন্যান্য মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রশ্রয় ছাড়া এতো বড় দুর্নীতি অসম্ভব।
এই চরম অনিয়ম ও ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষিতে সরকার ২৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে অপসারণ করে।
তার স্থলে অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অপসারণের পর তাজুল ইসলাম এক বিবৃতিতে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন—
“গণহত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতেই একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।”
প্রসিকিউটর তামিমও অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন।
তবে প্রকাশ্যে আসা ব্যাংক স্লিপ, অ্যাকাউন্ট নম্বর ও লেনদেনের প্রমাণ এই অস্বীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ আসনে বসে যদি কেউ নিরপরাধ মানুষকে জিম্মি করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এই অর্থের উৎস ও গন্তব্য খুঁজে বের করে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনতেই হবে।”