
গাইবান্ধা প্রতিনিধি | গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর–পলাশবাড়ী):
নির্বাচনী মাঠ মানেই কি কেবল হর্সপাওয়ারের হুঙ্কার? কালো কাচে মোড়া পাজেরোর বহর, তেলের গন্ধে ভেজা রাজপথ, মাইকের চিৎকারে চাপা পড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের কণ্ঠ—এই চেনা দৃশ্যের মাঝেই গাইবান্ধা-৩ আসনে যেন হঠাৎ গল্প বদলে গেছে।
কারণ এখানে ধুলো উড়িয়ে নয়, ধুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে—টুংটাং শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে একটি সাইকেল। চালক একজনই, আর তিনিই পুরো বহর। কাঁধে ঝোলানো হ্যান্ডমাইক, গলায় দৃঢ় বিশ্বাসের কণ্ঠ। প্রতীকে কোনো রকেট, নৌকা বা ঈগল নয়—গ্রামবাংলার চিরচেনা প্রাণের প্রতীক, একটি ঢেঁকি।
এই ব্যতিক্রমী প্রচারণার মানুষটির নাম মো. আজিজার রহমান। পেশায় শিক্ষক, পরিচয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী। তিনি সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর রোকেয়া সামাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। রাজনীতির প্রচলিত জৌলুশের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যেন এক নিঃশব্দ অথচ সাহসী গল্প লিখে চলেছেন।
আজিজার মাস্টার যেন প্রমাণ করে দিচ্ছেন—গণতন্ত্র চলতে পারে টাকা ছাড়া, তেল ছাড়া; শুধু পায়ের জোর আর মনের জোরে। যেখানে অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে থাকে গাড়ির বহর, কর্মীর ভিড় আর ব্যস্ততা, সেখানে তিনি একাই মিছিল। ড্রাইভারও তিনি, ঘোষকও তিনি। তার প্রচারণায় নেই কোনো ট্রাফিক জ্যাম—কারণ তার সাইকেলের পথ সোজা, মানুষের হৃদয়ের দিকে।
তার বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলার খোদা বকস গ্রামে। সাদামাটা উঠোন, সাধারণ সংসার। নেই পোস্টারের ঝলক, নেই ব্যানারের বাহার। কিন্তু আছে একরাশ দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস। যখন লাখ লাখ টাকার জ্বালানি পুড়িয়ে রাজনীতি ছুটে চলে, তখন আজিজার মাস্টার নিজের ক্যালোরি পুড়িয়ে প্যাডেল ঘোরান—গ্রাম থেকে গ্রামে, মানুষ থেকে মানুষের কাছে।
এই ব্যতিক্রমী প্রচারণা দেখে ভোটাররা থেমে তাকাচ্ছেন। কেউ হাসছেন, কেউ ভাবছেন। গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকানে জমে উঠছে আলোচনা—
“টাকা ছিটালেই কি ভোট হয়?”
“পাজেরোর চাকা বড়, কিন্তু মাস্টারের সাইকেলের দম আরও বড়!”
কেউ কেউ রসিকতাও করছেন—
“বাকিরা জিতলে জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভাঙবে, আর আজিজার ভাই জিতলে ঢেঁকিতে ধান ভানবেন মানুষের জন্য!”
প্রবাদ আছে—ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।
আজিজার রহমান যেন সেটিই নতুন করে দেখিয়ে দিচ্ছেন—ঢেঁকি চাইলে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারে, আর একটি সাইকেল চাইলে গণতন্ত্রকে এগিয়েও নিতে পারে।
নির্বাচনের ফলাফল কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
তবে ইতিহাস আজই লিখে রাখছে—গাইবান্ধা-৩ আসনে একজন মানুষ, একটি সাইকেল আর একটি ঢেঁকি নিয়ে গণতন্ত্রকে নতুন এক ছন্দে ডেকে এনেছিলেন।
এই নির্বাচন পাজেরোর হর্সপাওয়ার নয়, মনে রাখবে—
একজন মানুষের প্যাডেলের শব্দ।
গণতন্ত্রের এই ছন্দ এভাবেই ঘুরে যাক—
টুংটাং… টুংটাং।