
গত শুক্রবার থেকেই ইরানের জনগণের মধ্যে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গুজব ছড়িয়ে পড়ে—যে কোনো মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালাতে পারে। এই আশঙ্কা এখনো দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে। যদিও ইরান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংকট নিরসনে আলোচনার উদ্যোগ চলছে, তারপরও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। এমন বাস্তবতায় অনেক ইরানি জানালার কাচ শক্তভাবে বন্ধ করে দিচ্ছেন, মজুত করছেন খাবার ও পানি। রোববার মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তেহরানের ৪৩ বছর বয়সি এক প্রকৌশলী বলেন,
“আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম—কখন আঘাতটা আসবে। সকাল পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। বারবার জেগে উঠছিলাম, বিস্ফোরণের কোনো শব্দ পাই কি না, সেটাই শুনছিলাম। আজ রাতে কী হয়, দেখা যাক।”
আরেক বাসিন্দা শোহরেহ বলেন, মানুষের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারানোর কাছাকাছি চলে গেছে। তাঁর ভাষায়,
“অনেকে ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। ইসলামিক রিপাবলিক যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তাতে মানুষ ভীষণ হতাশ। তারা আর বুঝতে পারছে না—কোনটা তাদের পক্ষে, আর কোনটা বিপক্ষে।”
গত এক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন ফের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে আসছে। এর ফলে সংঘাতের আশঙ্কা ইরানিদের কাছে বাস্তব ও তাৎক্ষণিক ভয়ে রূপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি শুধু সৌদি আরব ও ইসরাইলের সঙ্গে নতুন করে বহু বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তির পথই খুলে দেয়নি; বরং ইরানিদের জন্য এটি নিয়ে এসেছে মানসিক চাপ, বিভ্রান্তি এবং এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের শঙ্কা।
৩২ বছর বয়সি সরকারি কর্মচারী আরজু বলেন, মানুষের মধ্যে এক ধরনের নীরব উদ্বেগ কাজ করছে। অনেকে যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলো নিয়ে কথা বলতে এড়িয়ে চলছেন—যেগুলো গত গ্রীষ্মে ইসরাইলের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় সবাই প্রত্যক্ষ করেছে।
তিনি বলেন, “সবাই শান্ত থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু মনে মনে সবাই অপেক্ষা করছে প্রথম বিস্ফোরণের।”
আরজু আরও জানান, তাঁর বাসার সামনের একটি ভবনের এক প্রতিবেশী জানালা বন্ধ করে দিয়েছেন।
“তিনি আমাকে বলেছেন—‘জানালা বন্ধ করে দাও। বোমা পড়লে তখন শাসক আর বিরোধীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।’”
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় টানা তিন সপ্তাহ ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আবার চালু হয়েছে। এখন এসব প্ল্যাটফর্মে ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা থেকে বাঁচার নানা পরামর্শ ছড়িয়ে পড়ছে।
এসব পরামর্শের মধ্যে রয়েছে—১০ দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখা, হাতের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স রাখা, পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এক ব্যাগে প্রস্তুত রাখা, জরুরি বের হওয়ার পথ খোলা রাখা, বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে খোলা জায়গায় চলে যাওয়া এবং দেওয়ালের পাশে মাটিতে শুয়ে পড়া। ফারসি ভাষার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এমন অসংখ্য নির্দেশনা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই আতঙ্ক শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০ লাখ ইরানি প্রবাসীর মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আবারও দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে—যেমনটি ১২ দিনের যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের সময় হয়েছিল। এতে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয় এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।