
সন্তানের গায়ের রঙ সাদা—সন্দেহের ‘অপরাধে’ সংসার ভাঙল
তিন বছরের আফিয়াকে নিয়ে মানবেতর জীবনযুদ্ধে মনিরা
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর
যশোরের রামনগর ইউনিয়নের মনিরা খাতুন। তিন বছরের কন্যা আফিয়াকে নিয়ে আজ লড়াই তার জীবনের সঙ্গে। মাত্র একটি কারণে ভেঙে গেছে তার সংসার—শিশুটির গায়ের রঙ সাদা।
২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নেয় মনিরা ও মোজাফফরের কন্যা আফিয়া। জন্মের পর থেকেই শিশুটির গায়ের রঙ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন স্বামী মোজাফফর। তিনি দাবি করতে থাকেন—শিশুটি তার নয়। মনিরার শত চেষ্টা ও ব্যাখ্যা সত্ত্বেও তাকে বিশ্বাস করাতে ব্যর্থ হন তিনি।
এর কিছুদিন পর বিদেশে যাওয়ার কথা বলে ঘর ছাড়েন মোজাফফর। পরে তালাক দিয়ে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এরপর থেকেই শিশুকে কোলে নিয়ে একাই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন মনিরা।
শিশু আফিয়া স্বভাবগতভাবে চঞ্চল ও হাসিখুশি হলেও বাবার কথা উঠলেই চুপ হয়ে যায়। মনিরা বলেন, “বাবা বলে ডাকলে ও থেমে যায়। হয়তো ছোট্ট মনের মধ্যেই বুঝে গেছে—ওর বাবা আর আমাদের জীবনে নেই।”
২০২৪ সালের ২১ মে গ্রামে সালিশ বৈঠক বসে। সেখানে মোজাফফরের বড় ভাই মাসে ১,৫০০ টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত এক টাকাও দেওয়া হয়নি।
গ্রামের সাবেক মেম্বার আব্দুল গফুর মোল্লা বলেন, “শুধু গায়ের রঙ আলাদা বলে একটি শিশুকে অস্বীকার করা ও স্ত্রীকে ত্যাগ করা—মানবিকতার কোনো মানদণ্ডেই পড়ে না।”
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. গোলাম মোর্তজা জানান—শিশুটির গায়ের রঙ কোনো রোগের কারণে নয়, জিনগত কারণেই এমন হতে পারে। চোখ বা ত্বকের কিছু যত্ন ছাড়া বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।
এ ঘটনায় মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে রামনগর ইউনিয়ন পরিষদ। প্যানেল চেয়ারম্যান রামপ্রসাদ রায় বলেন, “আমরা পরিবারটির পাশে দাঁড়াব।” যশোরের জেলা প্রশাসকও জানিয়েছেন—মনিরা যদি আশ্রয় বা আর্থিক সহায়তা চান, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন লোকের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে দিন পার করছেন মনিরা। তাঁর একটাই প্রত্যাশা—মেয়ে আফিয়া যেন নিরাপদে বড় হতে পারে।
মনিরার আক্ষেপ, “রঙ আলাদা বলেই কি আমার মেয়ের এই অবস্থা? ও কি কোনো অপরাধ করেছে?”