সাদুল্লাপুর (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে বিভিন্ন পাঠাগারে পর্যাপ্ত বইয়ের সংগ্রহ থাকলেও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে পাঠকের সংখ্যা। তথ্যপ্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের বাড়তি নির্ভরতার কারণে বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে বইয়ে সমৃদ্ধ পাঠাগারগুলোও অনেকটা পাঠকশূন্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন পাঠাগার ঘুরে দেখা গেছে, রকমারি বইয়ের সংগ্রহ থাকলেও পাঠক কক্ষে নেই আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য। অনেক পাঠাগারে নিয়মিত পাঠকের সংখ্যা হাতেগোনা। কোথাও আবার দিনের পর দিন পাঠকের দেখা মিলছে না।
এ পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করতে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে কাজ করছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে নির্দিষ্ট পয়েন্টে সরাসরি বই নিয়ে হাজির হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সাদুল্লাপুরে প্রতি বুধবার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নির্ধারিত স্থানে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির গাড়ি অবস্থান করে পাঠকদের বই পড়ার সুযোগ দিচ্ছে।
তবে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা হাসান জানান, সাদুল্লাপুরে পাঠকের উপস্থিতি খুবই কম। গাইবান্ধা জেলার মধ্যে এ উপজেলাতেই পাঠকের সংখ্যা সবচেয়ে কম বলে জানান তিনি। সাদুল্লাপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ, সাদুল্লাপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও সাদুল্লাপুর গার্লস (ডিগ্রি) কলেজে নির্ধারিত পয়েন্টে তেমন কোনো পাঠক পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে পুরোনো পয়েন্ট পরিবর্তন করে নতুন পাঠক পয়েন্ট নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সাদুল্লাপুর শিশু উদ্যানকে নতুন পয়েন্ট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নলডাঙ্গা, জামালপুর ও ধাপেরহাটের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নতুন পয়েন্ট নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, পাঠাগারে পাঠক ফিরিয়ে আনা এবং আগামী প্রজন্মকে চিন্তাশীল ও মননশীল হিসেবে গড়ে তুলতে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয়, পরিবার থেকেও সন্তানদের হাতে বই তুলে দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
এদিকে তরুণদের গড়ে তোলা সংগঠন ‘পরিবর্তন সংঘ’ও সবার মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরিতে কাজ করছে। সংগঠনটির পাঁচ শতাধিক সদস্যের উদ্যোগে পরিচালিত ‘পরিবর্তন পাঠাগারে’ বর্তমানে ৮০০টিরও বেশি বই রয়েছে। সাদুল্লাপুর হাইস্কুল মার্কেটে অবস্থিত এই পাঠাগারেও অবশ্য পাঠকের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।
পাঠাগারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সতেজ জানান, লাইব্রেরিতে যারা আসেন, তাদের বড় একটি অংশ চাকরির পরীক্ষার্থী। তারা মূলত নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন বই পড়তে আসেন। সাধারণ জ্ঞান, সাহিত্য ও জ্ঞানভিত্তিক বই পড়ার জন্য নিয়মিত পাঠকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের অধীনে সাদুল্লাপুর পাবলিক লাইব্রেরি থাকলেও সেখানেও বই ও পাঠকের সংকট রয়েছে। স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, বইয়ের পাঠক এখন অনেকটাই ইন্টারনেটমুখী। মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে লাইব্রেরিমুখী হওয়ার প্রবণতা কমে গেছে।
সাদুল্লাপুরে ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানকে সামনে রেখে বই পড়ার আন্দোলন ও ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে পাঠাগারকেন্দ্রিক কার্যক্রম চালু করা হলেও প্রত্যাশিত হারে পাঠক তৈরি হয়নি। ফলে অনেক পাঠাগার কার্যত পাঠক সংকটে রয়েছে।
গাইবান্ধা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের এক গ্রন্থাগারিক বলেন, আগের তুলনায় পাঠকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একুশে বইমেলাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে উৎসাহ দেখা গেলেও সারা বছর বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ক্রমেই কমছে। ইন্টারনেট ও ফেসবুকে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, ফলে অনেকেই লাইব্রেরিমুখী হতে চান না।
তবে পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে পাঠাগারগুলোতে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটানো, ডিজিটালাইজেশন, পাঠবান্ধব পরিবেশ তৈরি, নতুন বই সংগ্রহ এবং পাঠককেন্দ্রিক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও ব্যস্ততা বদলেছে। তাই বইকে শুধু পাঠাগারে রেখে দিলে হবে না; বরং বইকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠক তৈরির উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মতো উদ্যোগগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো সম্ভব নয়; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাসের সমন্বয় ঘটাতে হবে। নতুন প্রজন্মকে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠাগার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তবেই পাঠাগারের নীরবতা ভেঙে আবারও ফিরতে পারে পাঠকের কোলাহল।