জঙ্গল সলিমপুর: রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র—র্যাব কর্মকর্তার রক্তে উন্মোচিত ৪০ বছরের অন্ধকার সাম্রাজ্য
- আপডেট সময় : ০১:০৩:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৮৬ বার পড়া হয়েছে
জঙ্গল সলিমপুর: রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র—র্যাব কর্মকর্তার রক্তে উন্মোচিত ৪০ বছরের অন্ধকার সাম্রাজ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততার একেবারে সন্নিকটে, বায়েজিদ বোস্তামী থানা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত পাহাড়ি জনপদ জঙ্গল সলিমপুর। প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে ওঠার কথা থাকলেও চার দশকের বেশি সময় ধরে পাহাড় কাটা, অবৈধ দখল, অস্ত্রের মহড়া ও সশস্ত্র সন্ত্রাসের কারণে এলাকাটি আজ কার্যত এক ‘অঘোষিত নিষিদ্ধ রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় সেই সন্ত্রাসকবলিত এলাকাতেই দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত এই র্যাব কর্মকর্তার মৃত্যু শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়—বরং এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি রক্তাক্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
র্যাব সূত্র জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জঙ্গল সলিমপুর ও পার্শ্ববর্তী আলীনগরের গহিন পাহাড়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মজুদের খবর পাওয়া যায়। সেই তথ্য যাচাই ও অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে সোমবার সন্ধ্যায় র্যাব-৭-এর একটি দল অভিযানে নামে।
তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রবেশের মুহূর্তেই র্যাব সদস্যরা পড়ে যান পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদে। ওঁত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা হঠাৎ করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, হামলায় ব্যবহৃত হয় অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। এতে চারজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া মারা যান।
র্যাবের সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,
“এটি একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও ভয়ংকর হামলা। হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।”
চার দশকের অবৈধ সাম্রাজ্য
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের জঙ্গল সলিমপুর ভৌগোলিকভাবে সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও যোগাযোগ ও অবস্থানগত কারণে এটি চট্টগ্রাম মহানগরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পূর্বে হাটহাজারী, দক্ষিণে বায়েজিদ থানা—এই ত্রিভুজ সীমানার ভেতরে থাকা এলাকাটি বছরের পর বছর ধরে কার্যত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত চার দশকে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। ‘ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন’-এর আড়ালে গড়ে উঠেছে বিশাল প্লট বাণিজ্য। পাহাড় কেটে প্লট তৈরি, দখল ও বিক্রির মাধ্যমে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে।
অস্ত্রের পাহারায় পরিচয়পত্রের শাসন
জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে হলে সন্ত্রাসীদের অনুমতি প্রয়োজন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রতিটি প্রবেশপথে থাকে সশস্ত্র পাহারাদার। এলাকাবাসীর জন্য রয়েছে আলাদা পরিচয়পত্র—যা ছাড়া কেউ প্রবেশ বা বের হতে পারে না।
এমনকি পুলিশ, বন বিভাগ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এখানে অভিযান চালাতে গেলে জীবন ঝুঁকি নিয়ে ঢোকেন। অতীতে একাধিক উচ্ছেদ অভিযানে প্রশাসনের ওপর ককটেল, ইট-পাটকেল ও গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয় নতুন সংঘাত। পুরোনো ও নতুন আধিপত্য বিস্তারকারী গোষ্ঠীর মধ্যে দফায় দফায় বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
এছাড়া এই এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক সন্ত্রাসীদের হাতে মারধরের শিকার হন—যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্যও উদ্বেগজনক বার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন
রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে চলছে বেপরোয়া পাহাড় কাটা। দিনে পাহাড় কাটা হয়, রাতে চলে সশস্ত্র মহড়া। নগরে অপরাধ করে অনেক সন্ত্রাসী নিরাপদ আশ্রয় নেয় এই পাহাড়ে।
পাহাড় ন্যাড়া করে অবৈধ ঘর নির্মাণ, বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ—সবই চলছে প্রকাশ্যে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া ছাড়া এই অবস্থা সম্ভব নয়।
র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার মৃত্যু চট্টগ্রামসহ সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠকে বসেছেন এবং জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে বড় ধরনের সম্মিলিত অভিযানের প্রস্তুতি চলছে।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—সাময়িক অভিযান কি পারবে চার দশকের এই সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য ভাঙতে? নাকি আবারও সবকিছু আগের মতো চলবে?
স্থানীয়দের দাবি, জঙ্গল সলিমপুরকে স্থায়ীভাবে সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে শুধু মাঠের সন্ত্রাসীদের নয়, তাদের পেছনের রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। নইলে এই পাহাড়ে রক্ত ঝরতেই থাকবে, আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে হারাবে তার কর্তৃত্ব।
ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার আত্মত্যাগ যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে—জঙ্গল সলিমপুরকে প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই।









