শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী: মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
- আপডেট সময় : ০৫:৪৬:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ৮৭ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু। এরপর সরকারি চাকরি, পৌরসভার চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং দীর্ঘদিনের মহাসচিব—দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কর্মময় জীবনের নানা ধাপ পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির প্রার্থী হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
১৩ আগস্ট ২০২৬ বিএনপি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি সামনে আসে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। ফলে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সামনে এখন এক নতুন অধ্যায়ের দ্বার খুলে গেছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই মির্জা ফখরুল রাজনৈতিক ও জনসেবামূলক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হন।
তাঁর ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
শিক্ষা ও ছাত্ররাজনীতি
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ষাটের দশকের শেষভাগে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা আরও বাড়ে। ছাত্রজীবনের সেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। ঢাকা কলেজ, দিনাজপুর সরকারি কলেজ ও ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়।
পরবর্তীতে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং স্থানীয় পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
বিএনপিতে উত্থান
মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন ও নানা প্রতিকূলতার সময়ে মির্জা ফখরুল বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরবর্তী সময়ে দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়।
কঠিন সময়ে দলের নেতৃত্ব
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের নানা কঠিন সময় সামলাতে হয়েছে। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব, তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের সময় তিনি দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৬ সালে মন্ত্রী, এরপর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মোড় আসে। ১৩ আগস্ট বিএনপি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। এরপর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
দীর্ঘদিনের দলীয় নেতৃত্ব থেকে সরে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রার্থী হওয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশাপাশি ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নামও প্রার্থী হিসেবে এসেছে। ফলে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং মহাসচিব—দীর্ঘ কর্মময় ও রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হবে। নির্বাচিত হলে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ও রাজনৈতিক পথচলা দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।










