সাদুল্লাপুরে ‘ছাত্রলীগ ট্যাগে’ গ্রেপ্তার নাছিমের জামিনেও কাটেনি শঙ্কা: মুক্তির অপেক্ষায় স্ত্রী-সন্তান
- আপডেট সময় : ০৩:৩৯:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
- / ১৬৪ বার পড়া হয়েছে
সাদুল্লাপুরে ‘ছাত্রলীগ ট্যাগে’ গ্রেপ্তার নাছিমের জামিনেও কাটেনি শঙ্কা: মুক্তির অপেক্ষায় স্ত্রী-সন্তান

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার বাসিন্দা আবু হোসেন মো. নাছিম মণ্ডল (৩০) টানা প্রায় আড়াই মাস ধরে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। পরিবারের অভিযোগ, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ‘ট্যাগ’ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও তার স্বজনদের মনে এখনো কাটেনি শঙ্কা—কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেল গেট থেকেই আবারও তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
এদিকে ঈদের আগে বাবার মুক্তির আশায় দিন গুনছে নাছিমের তিন শিশু সন্তান ও স্ত্রী।
জানা গেছে, নাছিম গ্রেপ্তারের এক মাস ১০ দিন পর তার স্ত্রী রুমা খাতুন সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। ফুটফুটে নবজাতক কন্যা এখন এক মাসে পা রেখেছে, কিন্তু এখনো বাবার মুখ দেখা হয়নি তার। ক্লিনিকে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও সন্তান জন্মের পুরো সময়টুকু স্বামীবিহীন অবস্থায় একাই সামলাতে হয়েছে রুমাকে।
ঈদের আগে নাছিমের মুক্তির আশায় দিন গুনছে তার তিন শিশু সন্তান ও স্ত্রী। বড় ছেলে সাহাদ মণ্ডল (৭) এবং ছোট মেয়ের বয়স আড়াই বছর। তবে স্বজনদের আশঙ্কা—জামিন পেলেও কারাগার থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবারও তাকে জেল গেট থেকেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
পরিবারের দাবি, ভুয়া কমিটির কাগজ তৈরি করে নাছিমকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য—নাছিম কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে ২ মাস ১০ দিন পর গত ৮ মার্চ উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন পান। তবে জামিনের আদেশের কপি এখনো গাইবান্ধা আদালতে পৌঁছেনি।
স্বজনদের আশা, আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে আদেশের কপি পৌঁছালে গাইবান্ধা আদালতে জামিন আবেদন করা হবে।
নাছিমের স্ত্রী রুমা খাতুন বলেন, “স্বামী ছাড়া আমার সংসারে কেউ নেই। গাইবান্ধা আদালতে জামিন না পাওয়ায় অনেক কষ্ট করে বাবার বাড়ি থেকে এবং ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করে হাইকোর্টে আবেদন করেছি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আদালত জামিন দিয়েছেন। কিন্তু ভয় হচ্ছে—কারাগার থেকে বের হওয়ার পর আবার জেল গেট থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “শুনছি অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জামিনের পর আবার জেল গেট থেকেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অথচ নাছিম কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। তিনটি ছোট সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। ঈদের আগে বাবা বাড়ি আসবে—এই আশায় বাচ্চারা দিন গুনছে।”
বাবার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে নাছিমের বড় ছেলে সাহাদ মণ্ডল। সে বলে, “বাবাকে অনেকদিন দেখি না। আমি ক্যাডেট মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছি। পুলিশ বাবাকে ধরে কারাগারে দিয়েছে। আমার একটা নতুন বোন হয়েছে। কয়েকবার জেলে গিয়ে বাবাকে দেখে এসেছি। বাবা বলেছে ঈদের আগে বাড়ি আসবে, আমাদের জামা-কাপড় কিনে দেবে।”
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা শহরের একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নাছিমের কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। বর্তমানে স্ত্রী তিন সন্তান—দুই ছেলে-মেয়ে ও নবজাতক কন্যাকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাত প্রায় ১টার দিকে সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের পোস্ট অফিস সংলগ্ন বাসা থেকে পুলিশ নাছিমকে আটক করে। পরদিন তাকে গাইবান্ধা আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
নাছিম সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের কাজিবাড়ি সন্তোলা গ্রামের মৃত আবদুল মন্নাফ মণ্ডলের ছেলে। তার বাবা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিনি গ্রাম ও শহরের বাসার মধ্যে যাতায়াত করে সংসার চালাতেন এবং বাসার পাশে একটি স-মিলের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন বলে জানায় পরিবার।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্ররোচনায় ভুয়া ও সৃজনকৃত কমিটির তালিকা তৈরি করে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। প্রতিহিংসার জেরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিল-স্বাক্ষরযুক্ত কাগজে তাকে উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দেখানো হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১০ সালে উপজেলা ছাত্রলীগের শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হয়নি। সে সময় নাছিম ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। তাই তাকে ছাত্রলীগ নেতা দাবি করা প্রশ্নবিদ্ধ বলেই মনে করছেন স্বজনরা।
নাছিমের তিন বোনের মধ্যে বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে এবং ছোট বোন রংপুরে পড়াশোনা করছেন। বড় বোনের স্বামী সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা সুজা মিয়া। আরেক ভগ্নিপতি চঞ্চল ছাত্রলীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লা আল মামুন জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় দায়ের করা ১৭৬/২৫ নম্বর মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে নাছিমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ট্যাগ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। নাছিমের পরিবারের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক এবং জেল গেটে পুনরায় গ্রেপ্তার না করে তার ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা হোক।









