সংঘবদ্ধ ধ-র্ষণ ও মিথ্যা মামলা ফাঁসের ছক ভেস্তে দিল পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীরা, আটক ১
- আপডেট সময় : ০৬:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৪৬০ বার পড়া হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার :
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় সংঘটিত এক ভয়াবহ সংঘবদ্ধ ধ-র্ষণ ও পূর্বপরিকল্পিতভাবে নিরপরাধ যুবককে ফাঁসানোর চাঞ্চল্যকর ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস করেছে পুলিশ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকর্মীরা। গভীর তদন্ত ও একাধিক দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নির্মম চিত্র, যা পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের কাটাদুয়ার গ্রামে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধভাবে ধ-র্ষণ করা হয়। ঘটনার পর অভিযুক্তরা ভয়ভীতি, চাপ ও নানা প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগী তরুণীকে প্রকৃত ঘটনা গোপন রাখতে বাধ্য করে।
অভিযোগ রয়েছে, চক্রের মূলহোতা সৈয়দ আসাদুজ্জামান লিটন পূর্বশত্রুতার জেরে ধাপেরহাট এলাকার নিরপরাদধ বকশীগঞ্জ অনলাইন কম্পিউটার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের পরিচালক এস এম ইমরান ইসলামকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ধ-র্ষণের শিকার তরুণীকে ওই দিন সিএনজি যোগে প্রতিপক্ষ যুবকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাতের আঁধারে লিটন ও তার সহযোগীরা কাটাদুয়ার গ্রাম থেকে সিএনজি যোগে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের অদূরে, পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর মৌজার একটি তেলের পাম্প সংলগ্ন এলাকায় নিয়ে আসে।
ধ-র্ষণের শিকার হবিগঞ্জ জেলার আজমিরী থানার নগর গ্রামের শ্রী বিজয় চন্দ্র ঘোষের কন্যা পপি রানী ঘোষ (২৫) তার জবানবন্দিতে জানান, চতরা ইউনিয়নের কাটাদুয়ার গ্রামের সৈয়দ আব্দুল মাবুদ মিয়ার পুত্র মামলাবাজ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আসাদুজ্জামান লিটন, একই গ্রামের মৃত আব্দুল বারীর পুত্র সাদ্দাম হোসেন (৩৪) এবং তাদের আরও এক সহযোগী তাকে একটি ঘরে আটক রেখে টানা তিন দিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে ধ-র্ষণ করে।
ঘটনার পর অভিযুক্তরা ধাপেরহাট এলাকায় বসবাসরত নিরপরাধ এস এম ইমরান ইসলাম কে ধ-র্ষণ মামলায় ফাঁসানোর নীলনকশা আঁকে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রাতের আঁধারে ভুক্তভোগী তরুণীকে ধাপেরহাট ইউনিয়নের শেষ সীমানায় নিয়ে গিয়ে একটি সাজানো গল্প মুখস্থ করানো হয়। পরবর্তীতে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে অভিযুক্ত লিটনের উদ্যোগে তাকে ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ডিউটি অফিসার ইয়াকুব আলীর নিকট হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ ভুক্তভোগী পপি রানীকে চিকিৎসার জন্য গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পপিরানী ধাপেরহাট এলাকার এস এম ইমরান ইসলামের নাম উল্লেখ করে, যদিও সে স্বীকার করে যে, ওই যুবককে সে কখনো দেখেনি শুধু ছবি দেখানো হয়েছিল।
মেয়েটির বক্তব্য আমলে নিয়ে ১৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর একটি চায়ের দোকান থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে নেওয়া হয়।জিজ্ঞেসাবাদের জন্য নেওয়া এস এম ইমরান ইসলাম ও তরুণী পপি রানীকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তরুণী পপিরানীর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা ও বর্ণনায় গরমিল লক্ষ্য করায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্তে নামে পুলিশ।
গাইবান্ধা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিদ্রোহ কুমার কুন্ডের নেতৃত্বে সাদুল্লাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) মাহমুদুল হাসান, ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ স্বপন কুমার সরকার, পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) সুপদ হালদার, এসআই হাফিজুর রহমানসহ থানা ও তদন্ত কেন্দ্রের অন্যান্য কর্মকর্তাদের যৌথ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটিত হয়।
ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে চতরা ইউনিয়নের কাটাদুয়ার গ্রামের মৃত্যু আব্দুল বারীর পুত সাদ্দাম হোসেন (৩৪)-কে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সৈয়দ আসাদুজ্জামান লিটন নিজেই ধ-র্ষণে সরাসরি জড়িত এবং পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী সে। পূর্বশত্রুতার জেরে সে ধাপেরহাট এলাকার নিরপরাধ যুবক এস এম ইমরান ইসলাম কে ধ-র্ষণ মামলায় ফাঁসানোর অপচেষ্টা চালায়।
ঘটনার সঙ্গে আটক সাদ্দামের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাওয়ায় এবং ঘটনাস্থল পীরগঞ্জ থানা এলাকায় হওয়ায় সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে জিডি মূলে তাকে রংপুরের পীরগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করে। এ ঘটনায় পীরগঞ্জ থানায় পপি রানী ঘোষ বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে একটি ধ-র্ষণ মামলা রেকর্ডের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অপরদিকে পুলিশ জানায়, ধাপেরহাট এলাকা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক নিরপরাধ যুবক এস এম ইমরান ইসলাম এ ঘটনার কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে রাতেই পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে চতরা ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলাবাজ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আসাদুজ্জামান লিটন দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকর্মে জড়িয়ে এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে আসছে। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে সে যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—
“আর কত নিরপরাধ মানুষ এই ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হবে? অপকর্মের মূলহোতাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার কবে নিশ্চিত হবে?”
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর অভিযুক্ত লিটন একাধিক গণমাধ্যমকর্মীকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ ছড়ানোর চেষ্টা করে। তবে পুলিশ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকর্মীদের অনুসন্ধানে সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত সম্পন্ন করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।










