ওসমান হাদি হ’ত্যাকাণ্ড: কাউন্সিলর বাপ্পির সরাসরি নির্দেশে পরিকল্পিত খু”ন—ডিবির তদন্ত।
- আপডেট সময় : ০৩:৩৫:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৪৫ বার পড়া হয়েছে

ডেক্স রিপোর্ট:
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পেছনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পির সরাসরি নির্দেশ ছিল—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ায় শরিফ ওসমান হাদি কাউন্সিলর বাপ্পির কাছে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হন। এরপরই তাকে হত্যার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যার মূল নির্দেশদাতা ছিলেন বাপ্পি নিজেই।
পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড
ডিবির ভাষ্যমতে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত। অর্থের জোগান, অস্ত্র সংগ্রহ, ঘাতক নির্বাচন থেকে শুরু করে ঘটনার পর পালানোর রুট নির্ধারণ—সবই বাপ্পির ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়।
এ পর্যন্ত মামলায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া পলাতক ফয়সাল করিম মাসুদসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
অস্বাভাবিক সম্পদের পাহাড়
তদন্তে উঠে এসেছে, একসময়কার সাধারণ ঝুট ব্যবসায়ী বাপ্পি গত এক দশকে গড়ে তুলেছেন বিশাল অপরাধ ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, গার্মেন্টসের ঝুট নিয়ন্ত্রণ, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা এবং ফুটপাতের অস্থায়ী দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান।
২০২০ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামায় বাপ্পির সম্পদের বিবরণ ছিল সীমিত—মাত্র ৭০০ বর্গফুটের একটি টিনশেড ঘর। অথচ বর্তমানে সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে তিনতলা বিশাল ‘চৌধুরী ভিলা’, যা এলাকাবাসীর কাছে তার অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
হলফনামায় কোনো গাড়ির উল্লেখ না থাকলেও বর্তমানে তিনি হ্যারিয়ার জিপসহ অন্তত চারটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে প্রায় ৫০ বিঘা জমির ওপর একটি অটো ব্রিকফিল্ড গড়ে তুলেছেন, যেখান থেকে নিয়মিত বিপুল অর্থ আয় হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক উত্থান ও বিতর্ক
২০১২ সালে ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাপ্পির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। পরে ২০১৪ সালে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি হন এবং বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার সম্পদের হিসাব তলব করলেও অজ্ঞাত কারণে সেই তদন্ত আর এগোয়নি।
২০২১ সালে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্যজনকভাবে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
২০২০ সালের সিটি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েও কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বাপ্পি। তবুও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
যেভাবে নিহত হন শরিফ ওসমান হাদি
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক খুব কাছ থেকে শরিফ ওসমান হাদির মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
রাজনীতি ও অপরাধের অশুভ মেলবন্ধন
শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তি হত্যার ঘটনা নয়; বরং এটি রাজধানীর রাজনীতি, অপরাধ ও ক্ষমতার অশুভ মেলবন্ধনের নগ্ন চিত্র—যা নতুন করে দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।










